৭ই ডিসেম্বর, ২০২৫ 🔻 ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২🔻 ১৫ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭

বেড়া-সাঁথিয়ার এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক

শেয়ার করুন:

বিশেষ প্রতিনিধিঃ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও নীতিমালা-২০২১ এর ১১.১৭ ধারা মোতাবেক, এমপিওভুক্ত কোন শিক্ষক-কর্মচারী একই সাথে একাধিক কোন পদে/চাকরীতে বা আর্থিক লাভজনক কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। এটি তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকার তার এমপিও বাতিলসহ দায়ী ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে বিধিমোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। আবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরাও নিজে বা নিজের পরিবারের কেউ অন্য কোন লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হতে পারবেন না- মর্মে সরকারি নীতিমালা থাকলেও ওই নীতিমালার তোয়াক্কা করছেন না পাবনার বেড়া-সাঁথিয়া উপজেলার এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক।কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের তথ্যমতে, এই দুই উপজেলায় প্রায় তিনশতাধিক কিন্ডারগার্টেন/প্রাইভেট স্কুল রয়েছে। যার মধ্যে অর্ধ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষক কিংবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

বিভিন্ন কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ক্লাসে না পড়িয়ে কিন্ডারগার্টেন বা প্রাইভেট স্কুলে গিয়ে একের পর এক ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্ডারগার্টেনের ক্লাস মর্নিং শিফটে হওয়ায় তারা ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ২-৩টি ক্লাস নিয়ে পরে কলেজে হাজির হন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকও এভাবে মর্নিং শিফটে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ক্লাস নিয়ে থাকেন  বলে জানা গেছে। তাদের সকালটা যেহেতু কিন্ডারগার্টেনে ক্লাস নিয়ে শুরু হয়, ফলে তাদের মূল কর্মস্থলে গিয়ে তারা মনোযোগের সাথে পাঠদান ব্যর্থ হন বলে অভিভাকদের অভিযোগ রয়েছে।
উচ্চ শিক্ষিত কিছু তরুণের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৫ দিনে বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন স্কুলে সরেজমিন ঘুরে এ প্রতিবেদক অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পান। সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, বেড়া পৌর এলাকার ট্যালেন্ট কিন্ডার গার্টেন, মিলেনিয়াম কিন্ডার গার্টেন এন্ড হাইস্কুল, রেইনবো স্কুল এন্ড কলেজ, কাশিনাথপুরের কামরুজ্জামান ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ, সালেহা বেগম ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, কাশিনাথপুর ভোকেশনাল হাই স্কুল, কাশিনাথপুর বিজ্ঞান স্কুল এন্ড কলেজ, ছায়ানীড় ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, মাশুমদিয়া আইডিয়াল একাডেমি, সাগরকান্দির লুৎফর-নুরজাহান স্কুল, ফকিরকান্দি মেধা বিকাশ কিন্ডারগার্টেন, সাঁথিয়া উপজেলার নন্দনপুর ইছামতি মডেল স্কুল, কাশিনাথপুর কলেজিয়েট স্কুল, ব্রাইট একাডেমি, কাশিনাথপুর আইডিয়াল একাডেমি, কাশিনাথপুর ডিজিটাল স্কুল এন্ড কলেজসহ প্রায় অর্ধশতাধিক স্কুলের মালিক বিভিন্ন স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্ত ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। যারা তাদের নিজেদের মূল কর্মস্থলের চাইতে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রাইভেট স্কুলে বেশি সময় ও মেধা ব্যয় করে থাকেন।  
বেড়ার আমিনপুর এলাকা থেকে সালেহ সালেম নামের এক ব্যক্তি অভিযোগে বলেন, আমরা স¤প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে এসেছি। কিন্ডারগার্টেনে চাকরীর জন্য গেলে স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিজ্ঞতা নাই বলে ফুলটাইম চাকরীর বিনিময়েও আমাদের বেতন দুই হাজারের বেশি দিতে চায় না। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বা কলেজের শিক্ষকদের খÐকালীন ক্লাসের জন্যও চার-পাঁচ হাজার টাকা বেতন দিয়ে থাকেন। এটা বৈষম্য। এই বৈষম্য দূর হওয়া দরকার। তাছাড়া সরকারি বেতন পাওয়ার পরেও স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা কিন্ডারগার্টেনে ক্লাস নিলে আমাদের মত বেকারদের কী হবে?

 বেড়া পৌর এলাকা থেকে সুদেব কুমার নামের এক কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক অভিযোগে জানান, কলেজ বা প্রাইমারী শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত কথাটি লিখে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করছে অনেক কিন্ডারগার্টেন স্কুল। ফলে আমরা যারা বেকার যুবক আছি; তারা স্কুলের শিক্ষার্থী ভর্তিতে হিমশিম খাচ্ছি।
সাঁথিয়া পৌর এলাকা থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক বলেন, সরকারি বেতনভুক্ত শিক্ষকদের গত ১৮ মাসে সরকার বসিয়ে বেতন দিয়েছে। আমরা যারা কিন্ডারগার্টেনের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল, তারা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছি। এখন সরকার স্কুল খুলে দিলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা আমাদের পেশার উপর ভাগ বসাচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা প্রশাসনের কাছে এ সমস্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবী জানাচ্ছি।
অভিযোগকারী কয়েক কিন্ডারগার্টেন মালিক ও শিক্ষক বলেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা সরকারি বেতন ভোগ করার পরেও যদি এভাবে বিধিবহির্ভূতভাবে কিন্ডারগার্টেনের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন, তবে জনস্বার্থে আমরা কিছু পরিচালক শিগগিরই হাইকোর্টে রিট করার উদ্যোগ গ্রহণ করবো। দেশের উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের জন্য কিন্ডারগার্টেন স্কুল পরিচালনার পূর্ণ সুযোগ প্রদানের জন্য জোর দাবী জানান তারা।
 সাঁথিয়ার নন্দনপুর ইছামতি মডেল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ও জোড়গাছা ডিগ্রী কলেজ শিক্ষক রাশেদ সালাহউদ্দিনের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি শুধু ঐ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আছি। সেখান থেকে আমি কোন ডিউটি এবং বেতন ভোগ করি না সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে আমি কোন কিছুই করি না।
 বেড়ার মিলেনিয়াম কিন্ডারগার্টেন এন্ড হাইস্কুল এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ও কলেজ শিক্ষক মোজাম্মেল হকের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি শুধু প্রতিষ্ঠাতা, আমি সেখানে কোন ক্লাস নেইনা। আমার স্টাফ আছে তারা মিলেনিয়াম কিন্ডারগার্টেন এন্ড হাইস্কুলটি দেখাশোনা করেন।
 বেড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খবির উদ্দিন বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা নির্দিষ্ট টাইমে আসবে এবং নির্দিষ্ট টাইমে বের হবে। এর বাহিরে কে কি করে সেটা তো আমি বলতে পারব না। এর মধ্যে যদি কোন শিক্ষক আমার এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের লেখাপড়ার ক্ষতি করে বা সময় নষ্ট করে ব্যাক্তিগত কিন্ডার গার্টেনে সময় দেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিব।
 বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহা. সবুর আলী জানান, এই বিষয়ে আমি কোন অভিযোগ পাইনি,  আপনার কাছেই প্রথম শুনতে পেলাম। এবিষয়ে লিখিত কোন অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নিব।